অফিসের ৪৪ তলা ভবনের ২৩ তলায় বসে রাতের ঝলমলে শহরের দিকে তাকিয়ে ছিলেন এক সফল তরুণ। চারপাশের আলো আর উঁচুতে ওঠার এই বাস্তবতা হয়তো তার অর্জনের কথাই বলে। কিন্তু সেই কাচের জানালার ওপারে দাঁড়িয়ে বারবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল ৯০-এর দশকের এক বৃষ্টিভেজা বিকেল এক হাতে ছাতা, অন্য হাতে ছোট ছেলেকে ধরে এক মায়ের স্কুলপানে হেঁটে যাওয়ার দৃশ্য।
সম্প্রতি এক ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে নিজের শৈশব ও মায়ের দীর্ঘ ৩৩ বছরের অভূতপূর্ব লড়াইয়ের এই গল্পটি শেয়ার করেছেন শাহরিয়ার শুভ। তার এই স্পর্শকাতর ও অনুপ্রেরণাদায়ক ফেসবুক স্ট্যাটাসটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে এবং হাজারো নেটিজেনদের হৃদয়ে গভীরভাবে রেখাপাত করেছে।
দেড় বছরের সন্তান ও এক তরুণী বিধবার লড়াই
গল্পটি শুরু হয়েছিল ৯০-এর দশকে। শুভর বয়স তখন মাত্র দেড় বছর, আর তখনই তার বাবা মারা যান। পরিবার থেকে তরুণী মাকে আবার বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও, তিনি সন্তানকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকার পথ বেছে নেন।
পকেটে টাকা নেই, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এমন এক পরিস্থিতিতে মাত্র ৫০০ টাকা বেতনে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা শুরু করেন তার মা। একটি শিশুর দুধ, জামা-জুতা, পড়াশোনা আর সংসারের যাবতীয় খরচ সেই সময়ে ৫০০ টাকায় কীভাবে চলত, তা আজও ভাবলে শুভকে অবাক করে। নিজের প্রয়োজনকে সব সময় শেষ সারিতে রেখেছিলেন সেই মা। পরবর্তীতে ১,৫০০ টাকা বেতনে একটি কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগ দেন তিনি।
সেলাই করা জুতা ও এক নীরব ত্যাগ
"মায়ের নিজের বলতে তেমন কিছু ছিল না—একটি বোরখা, এক-দুটি জামা আর এক জোড়া জুতা। জুতা ছিঁড়ে গেলে মুচির কাছে সেলাই করানো হতো। আবার ছিঁড়ত, আবার সেলাই," ফেসবুকে স্মৃতিচারণ করে লেখেন শুভ।
ছেলেবেলায় সহজ মনে হলেও, শুভ আজ অনুধাবন করেন মা নতুন জুতা কেনেননি কেবল সেই টাকাটা সন্তানের কোনো প্রয়োজনে বাঁচিয়ে রাখবেন বলে।
স্কুল থেকে ফিরে এসেও ছুটির সুযোগ ছিল না। বিকেলে এক ব্যাচের পর আরেক ব্যাচ প্রাইভেট পড়ানো, তারপর ঘরের রান্না, ঘর পরিষ্কার, কাপড় ধোওয়া সব একা হাতে সামলেছেন। অসুস্থ শরীরেও থেমে থাকেননি, কারণ পাশে এসে দাঁড়ানোর মতো কেউ ছিল না।
শুভ তার স্ট্যাটাসে লেখেন, অনেক সময় মা ঘরে এসে ঠিকমতো খেতেন না। বড় হয়ে বুঝেছেন, যে ছাত্র-ছাত্রীদের পড়াতেন, তাদের বাসা থেকেই হয়তো দুপুরে বা রাতে তাকে খেতে দেওয়া হতো—আর নিজের খাবারটি বাঁচিয়ে রাখতেন সন্তানের জন্য।
সমাজকে জবাব দেওয়ার অস্ত্র ছিল ‘ধৈর্য’
একজন স্বামীহীন নারীর জন্য সমাজে একলা টিকে থাকা মোটেও সহজ ছিল না। পদে পদে শুনতে হয়েছে অপবাদ, সহ্য করতে হয়েছে অবহেলা আর মানুষের চোখ রাঙানি। কিন্তু কোনোদিন কারও কাছে অভিযোগ করেননি তিনি। সব চুপচাপ সহ্য করে পরের দিন আবার কাজে নেমে পড়েছেন, কারণ তার লক্ষ্য ছিল একটাই ছেলেকে মানুষ করা।
শুভ বলেন, "আমার মায়ের সবচেয়ে বড় সম্পদ টাকা ছিল না, তার সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল ধৈর্য। তিনি কখনো আমাকে বলেননি'তোর জন্য আমি এত কষ্ট করেছি'।"
৩৩ বছরের সংগ্রাম ও আজকের সাফল্য
মায়ের সেই ৩৩ বছরের ত্যাগ আর ধৈর্যের ফল আজকের শাহরিয়ার শুভ। পড়াশোনা শেষ করে তিনি নিজেকে একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলেছেন। আর তার মা-ও নিজের যোগ্যতায় আজ একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক এবং বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন।
তবে আজও যখন শুভ মাকে নিয়ে কোনো বড় শপিং মল বা লিফটে ওঠেন, মা কিছুটা অস্বস্তি বোধ করেন, ভয় পান। শুভ লিখেছেন, "যে নারী আমাকে এত দূর নিয়ে এলেন, তিনি নিজে কেন আগের জায়গাটাতেই রয়ে গেলেন? উত্তরটা আমি নিজেই পাই—কারণ তিনি নিজের জীবনটা আমার পেছনে খরচ করেছেন। আমাকে সামনে ঠেলে দিয়ে নিজে পেছনে দাঁড়িয়ে থেকেছেন।"
মায়ের ঋণ কখনো শোধ হওয়ার নয়
নিজের অবস্থানের পেছনের মূল কারিগরের কথা স্মরণ করে শাহরিয়ার শুভ তার ফেসবুক পোস্টের শেষে লিখেছেন, "আজ আমি পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় দাঁড়িয়ে যদি বলি 'আমি এখানে পৌঁছেছি', তার পেছনে আসলে বলতে হয় আমার মা আমাকে এখানে পৌঁছে দিয়েছেন। আমার আজকের এই সফলতার পেছনে রয়েছে মায়ের একটি ৫০০ টাকার চাকরি, ১,৫০০ টাকার বেতন, এক জোড়া সেলাই করা জুতা, একটি পুরোনো বোরখা আর মাইলের পর মাইল হেঁটে যাওয়া পথ।"
তিনি আরও যোগ করেন, "আমার সবচেয়ে বড় পরিচয় আমি কত টাকা আয় করি বা কত উঁচুতে দাঁড়িয়েছি তা নয়; আমার সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো আমি সেই মায়ের ছেলে, যিনি নিজের জীবনটা ছোট করে আমার পৃথিবীটা বড় করে দিয়েছেন।"
আবেগঘন এই ফেসবুক পোস্টের লেখক শাহরিয়ার শুভ চাঁদপুর জেলার শাহরাস্তি উপজেলার চিতোষী পূর্ব ইউনিয়নের চিতোষী গ্রামের সন্তান। তিনি দেশের অন্যতম স্বনামধন্য ট্রাভেল এজেন্সি Travel Next BD'-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (CEO)।