নয়া রাজনৈতিক শক্তির চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাবনা
লেখক: নাঈম আহমাদ
পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাস এগিয়েছে নানা মোমেন্টামের মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের ইতিহাসেও দুটি বড়ো রাজনৈতিক মোমেন্টাম লক্ষ্য করা যায়- ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের পরবর্তী সময় এবং ৩৬শে জুলাই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়। সাধারণত আমরা নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্য দিয়েই রাজনৈতিক লড়াই বা মুক্তির পথ খুঁজি। কিন্তু ইয়াহিয়া খান কিংবা শেখ হাসিনার মতো শাসকরা যখন সেই পথ বন্ধ করে দেয়, তখন মুক্তিকামী জনতা মুক্তিযুদ্ধ কিংবা গণঅভ্যুত্থানের দিকে ধাবিত হয়।
২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর আমাদের সম্মিলিত রাজনৈতিক শক্তি সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়েও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে শেখ হাসিনার পতন ঘটাতে ব্যর্থ হয়। এই দিনে বিএনপি, জামায়াত, ৬ দলীয় গণতন্ত্র মঞ্চ, ১২ দলীয় জোট, ১১ দলীয় জোট, এলডিপি, এবি পার্টি, লেবার পার্টিসহ আওয়ামী দুঃশাসনবিরোধী সব পক্ষ যুগপৎ সমাবেশ ডেকেছিল ঢাকায়। কিন্তু স্বৈরাচারী হাসিনা স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে নিরস্ত্র বাংলাদেশিদের ওপর র্যাব-পুলিশ-ছাত্রলীগ দিয়ে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে সেই সমাবেশ ভণ্ডুল করে দেয়। শাপলা চত্বরের খুনি পল্টনে কতজন মুক্তিকামী জনতার রক্ত পান করেছিল, তারও কোনো সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি। কারণ নিহতদের তথ্য গোপন করা ছিল হাসিনার এক বীভৎস কৌশল।
এই ব্যর্থতা আমাদের হতাশ করেছিল। মনে হচ্ছিল- বুঝি আমাদের মুক্তির সম্ভাবনা শেষ। খুনি হাসিনা রূপকল্প ২০৪১-ই বুঝি আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়তি! কিন্তু ইতিহাসে আমরা বারবার দেখেছি- যখন মানুষ আশা হারায়, তখনই মহান আল্লাহর সাহায্য নেমে আসে। সূরা ইউসুফের ১১০ নাম্বার আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘এমনকি যখন নবীরা লোকদের থেকে হতাশ হয়ে গেল এবং লোকেরাও ভাবলো- তাদেরকে মিথ্যা বলা হয়েছিল, তখন অকস্মাৎ আমার সাহায্য নবীদের কাছে পৌঁছে গেল। তারপর এ ধরনের সময় যখন এসে যায়, তখন আমার নিয়ম হচ্ছে- যাকে আমি চাই, তাকে রক্ষা করি এবং অপরাধীদের প্রতি আমার আযাব তো রদ করা যেতে পারে না।’
অবশেষে আল্লাহ আমাদের মাঝে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর নির্দলীয় প্ল্যাটফর্মকে তুমুল জনপ্রিয় করে তুললেন। ধর্ম-বর্ণ ভেদাভেদ ভুলে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব স্তরের ছাত্র-জনতা এই ব্যানারের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন শুরু করল। নজিরবিহীন সাহসিকতার পরিচয় দিলেন সমন্বয়করা। তাঁদের হিম্মত ছিল পাহাড়সম। পাশাপাশি সারাদেশে মানুষ নিজ দায়িত্বে নেতৃত্ব গ্রহণ করল এবং নেতৃত্ব দিলো। খুনি হাসিনা হাজার হাজার ছাত্র-জনতাকে হত্যা করেও এবার নিজের মসনদ টিকিয়ে রাখতে পারল না। ৩৬শে জুলাই আমরা পেলাম মুক্ত বাতাসের সন্ধান। পেলাম এক স্বৈরাচারমুক্ত নতুন স্বদেশ- ‘বাংলাদেশ ২.০’।
ছাত্র-জনতার মাঝে আকাঙ্খা জন্ম নিলো- এই নতুন বাংলাদেশ পুনর্গঠিত হবে আমাদের নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধের আলোকে। ১৯৪৭, ১৯৭১ এবং ২০২৪-এর মধ্যে আমরা একটি অস্তিত্বের পরম্পরা দেখতে পেলাম। সেই আলোকেই আমাদের সামনে হাজির হলো এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা ও মোমেন্টাম। প্রাথমিকভাবে আমরা ভেবেছিলাম- অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে সবাই ‘জুলাইয়ের স্পিরিট’ ধারণ করে রাজনীতি করবে। সকল রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠী দিল্লির গোলামি মুক্ত হয়ে হাঁটবে বাংলাদেশপন্থী রাজনীতির পথে। দেশ সংস্কারের পাশাপাশি পুরাতন রাজনৈতিক দলগুলোতে আমূল সংস্কার হয়ে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত হাজির হবে। কিন্তু স্বল্পসময়ের মধ্যেই আমরা টের পেলাম- সামগ্রিক সংস্কারের চেয়ে দলগুলো নিজস্ব ফায়দা লুটতে অধিকতর মনোযোগী।
মাত্র ২১ দিনে যে খুনি হাসিনা ২ হাজারের অধিক ভাই-বোনকে শহীদ করে বিদেশে পালিয়ে গেল, সে দিল্লির আশ্রয়ে বসে আবারও শুরু করল দেশ-বিরোধী ষড়যন্ত্র। আমরা সেই খুনি দলকে বিচারের মুখোমুখি করতে ব্যর্থ হলাম। আহতদের চিকিৎসা এবং শহীদ পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনের প্রক্রিয়ায় দেখা গেল নিষ্ঠুর ধীরগতি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পারফরম্যান্সে দিন দিন হতাশা দেখা দিলো। পুলিশ প্রশাসন বিভিন্ন ইস্যুতে সক্রিয়ভাবে নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করল। ১৯৭২-এর সংবিধান বাতিল করতেও আমরা ব্যর্থ হলাম। এমনকি অভ্যুত্থানের মহানায়কদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষার জন্য যে প্রোক্লেমেশন জারি করা জরুরি ছিল, সেটাও ফিকে হয়ে গেল। এই প্রায় প্রতিটি ইস্যুতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বাগড়া দিলো বিদ্যমান বড়ো রাজনৈতিক দলগুলো। মানুষের মাঝে যে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফিরে এসেছিল, তারা আবার দীর্ঘশ্বাসে যুক্ত হলো। তাহলে কি বিপ্লব বেহাত হতে চলেছে?
মূলত হাসিনা পতন আন্দোলন আমাদের প্রায় সকল রাজনৈতিক পক্ষ ও মুক্তিকামী জনতাকে ঐক্যবদ্ধ করেছিল। কিন্তু অভ্যুত্থানের পর সেই চিত্র অনেকটাই পরিবর্তিত হয়ে গেল। রাজনৈতিক পক্ষগুলোর কর্মীরা স্ব-স্ব দলের কর্মসূচিতে অধিকতর মনোযোগী হয়ে উঠল। এক দফার অনুসারীদের মধ্যে হাজির হলো নিজস্ব অংক। রাজনৈতিক দলগুলোও নিজের লাভ-ক্ষতির অংক কষতে ক্যালকুলেটর নিয়ে বসে পড়ল। এমতাবস্থায় একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে গেল- যদি অভ্যুত্থানের পক্ষে বিপ্লবের লক্ষ্যে একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক শক্তি বা দল গড়ে না ওঠে, তাহলে আমরা আর আমাদের নতুন স্বাধীনতা ও সম্ভাবনাকে রক্ষা করতে পারব না। পাশাপাশি যে মুক্তিকামী জনতা হাসিনার মতো জগদ্দল পাথরকে উৎখাত করেছে, তারা সম্ভাব্য নতুন স্বৈরাচারদের রুখে দিতে ভবিষ্যতে পাবে না কোনো নির্ভরযোগ্য পাটাতন।
৩৬শে জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশি নাগরিকদের মনোভাবেও এসেছে বিশাল পরিবর্তন। এখন অসংখ্য তরুণ-তরুণী বাংলাদেশ পুনর্গঠনে অংশগ্রহণ করতে চায়। কিন্তু সেই পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া কোন পাটাতনে দাঁড়িয়ে তারা করতে পারবে, সেটাই সবার আলোচ্য বিষয়। ৩৬শে জুলাইয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে বড়ো দুটি রাজনৈতিক দলের পতন ঘটেছে। একটি হলো আওয়ামী লীগ, অপরটি জাতীয় পার্টি। এছাড়া পতন ঘটেছে তাদের ছোটো ছোটো দোসরদেরও। আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ না হলেও নৈতিক কারণে তারা আর মানুষের সামনে দাঁড়াতে পারবে না কিংবা মানুষ তাদের প্রতিহত করবে। অন্যদিকে, গত ১৬ বছর আওয়ামী লীগের ক্রীড়ানকে পরিণত হওয়ায় জনমনে ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয়েছে জাতীয় পার্টি। ফলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি সম্ভাবনাময় শূন্যস্থান তৈরি হয়েছে।
এমতাবস্থায় একাধিক নয়া রাজনৈতিক শক্তির উত্থান অবশ্যম্ভাবী বলে দাবি করাটা মোটেও বাড়াবাড়ি নয়। তবে এই নয়া রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটানো অত্যন্ত কঠিন কাজগুলোর একটি। শূন্যস্থান প্রকৃতির নিয়মেই পূরণ হয়, এটা যেমন সত্য; তেমনি সেই শূন্যস্থান যোগ্যরাই পূরণ করতে সক্ষম হবে, এটাও সত্য। অর্থাৎ ছাত্রদের হাত ধরে যে নয়া রাজনৈতিক দলের উত্থান ঘটেছে, সেটা যোগ্যতার সাপেক্ষেই এগিয়ে চলবে। তারা যদি সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশপন্থী মানুষের আবেগকে ধারণ করতে পারে, সর্বদা আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করে, ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়, মানুষের মৌলিক অধিকারকে তাদের ইশতেহারের মুখ্য বিষয়ে পরিণত করতে পারে এবং প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক ও পদ্ধতিগত রাজনীতি উপহার দেয়; তবে তারাই হয়ে উঠতে পারে আগামীদিনের এক শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি।
আবারও বলছি- এই বিষয়গুলো রাজনৈতিক মহলে মুখরোচক আলোচ্য বিষয় হলেও প্রকৃতপক্ষে কেউ এখন পর্যন্ত এসব বাস্তবায়ন করতে পারেনি। যদি ছাত্রদের নেতৃত্বাধীন দলও তা করতে ব্যর্থ হয়, তবে তারাও কোনো শক্তিশালী বড়ো দল গড়ে তুলতে পারবে না।
নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্ত স্লোগান সর্বস্ব না হয়ে বাস্তবায়ন করে দেখাতে হবে। যদি ছাত্রদের দল ব্যর্থ হয়, তবে কি আমরা আবার আগের দৃশ্যে ফিরে যাব? আবার আমাদের ঘাড়ে ফ্যাসিবাদ চেপে বসবে? আমি মনে করি না। ছাত্ররা ব্যর্থ হলে, উদার মনের পরিচয় না দিলে, দলকে কুক্ষিগত করতে চাইলে বা ইতিবাচক ধারায় রাজনীতি বিনির্মাণ করতে না পারলে প্রত্যাখ্যাত হবে; এটা যেমন সত্য, তেমনি আবার একই পাটাতন থেকে আরেকটি গ্রুপের উত্থান ঘটবে, যারা সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে এগিয়ে আসবে; এটাও সত্য।
ফলে আমাদের নির্দিষ্ট কোনো দল বা ব্যক্তির প্রতি নির্ভর না করে নির্দিষ্ট কিছু ক্রাইটেরিয়ার দিকে লক্ষ্য রাখা জরুরি। প্রধান ক্রাইটেরিয়া হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের সংমিশ্রণ। যে বা যেই দল এই ইতিবাচক ক্রাইটেরিয়া পূরণ করতে পারবে, তারাই হবে নয়া বাংলাদেশের নয়া রাজনৈতিক শক্তি; নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্তের প্রধান স্টেকহোল্ডার। ইনকিলাব জিন্দাবাদ!
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সমাজকর্মী।