যেভাবে বখে যায় আমাদের সন্তানেরা – শারমিন আকতার
অভিমতযেভাবে বখে যায় আমাদের সন্তানেরা শারমিন আকতারশারমিন আকতারপ্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৪ ০৬:৪৬ মানুষকে বলা হয় সৃষ্টির সেরা জীব তথা ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ ।মানুষ মূলত স্বাধীন এবং যাচাই ক্ষমতাসম্পন্ন জীব তথা প্রাণী ।বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তির মাধ্যমে বিভিন্ন কাজ বা ঘটনাকে মানুষ বিচার-বিশ্লেষণ করতে পারে । কোনটা ন্যায় কোনটা অন্যায় তা অনুধাবন করার মাধ্যমে গ্রহণ ও বর্জন নীতিও মানুষ অবলম্বন করতে পারে নির্দ্বিধায়। ধীশক্তির অধিকারী হওয়ায় মানুষ ভালোকে মন্দ থেকে পৃথকও করার ক্ষমতা রাখে। সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক মানুষকে প্রদত্ত এই অভাবনীয় যাচাই ক্ষমতা থাকার পরও কেন আজ আমাদের সমাজ মানবিকতাহীন ও মূল্যবোধহীন মানুষের আনাগোনা?
কেন আমরা আস্তে আস্তে ভ্রষ্ট জাতিতে পরিণত হয়ে যাচ্ছি? কেন আমারা আমাদের বর্তমান প্রজন্মকে ন্যায় ও অন্যায়ের পথ সুস্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিতে পারছি না কেন পরিবারে পরিবারে বখে যাচ্ছে আমাদের সন্তানেরা?আমাদের তথাকথিত আধুনিক সমাজের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই অন্যায় করার পরও দিনের পর দিন আমরা আমাদের সন্তানদেরকে শাসন করি না। অন্যায় করার পরও ছেলে সন্তানকে আমরা ছাড় দিই এই বলে “ছেলেরা একটু এমনই হয়!” এই একটি মাত্র আস্কারামূলক বাক্য সমাজে ছেলেদের অবস্থানকে ভারসাম্যহীন করে তুলছে। অধিকাংশ পরিবারেই আমাদের ছেলে সন্তানেরা ছাড় পেয়ে পেয়ে বড় হয়।
একটু বুঝ হবার পর থেকে সামাজিক নানা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের মগজে ঢুকিয়ে দেয়া হয়, ছেলেরা একটু অ্যাকটু দুষ্টামি, অসভ্যতা করেই থাকে। বড় হলে সব ঠিক হয়ে যাবে! বড় হয়ে আদৌ ঠিক হয় কি আমাদের সন্তানেরা?একই পরিবারে বেড়ে উঠা ছেলে-মেয়ে যখন ভাই-বোন হিসেবে পাশাপাশি বড় হতে থাকে তখন ছেলে সন্তান কোনও ভুল বা দুষ্টামি করলে শুধুমাত্র ছেলে হবার কারণে সহজেই ছাড় পেয়ে যায়। একই ভুল বা দুষ্টামি আবার যদি মেয়ে সন্তান করে সে কিন্তু ছাড় পায় না। বরং শুধুমাত্র মেয়ে হবার কারণে তাকে গঞ্জনার শিকার হতে হয়। সে যতই ছোট হোক না কেন; যতই তার মানসিক ও শারীরিক বিকাশ কম হোক না কেন। ছোটবেলা থেকেই পরিবারে মেয়েদেরকে আঙ্গুল দেখিয়ে শেখানো হয়…মেয়ে মানুষের এতো চঞ্চলতা, এতো রাগ, এতো দুষ্টামি ঠিক না। মেয়ে মানুষকে অন্য মানুষের ঘরে যেতে হবে। ধৈর্য ধরে অনেক কিছু সহ্য করতে হবে। মেয়ে মানুষের এটা করা যাবে না, ওটা করা যাবে না; এতো এতো কিছু শিখতে হবে, কোনোভাবে ভুল কিছু করা যাবে না! আমাদের সমাজে সাধারণত নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে এমন ঘটনার অবতারণা হয়।
প্রগতিশীল মানুষদের কাছে বাহ্যিক দৃষ্টিতে এটা এক ধরনের অমানবিক এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন মনোভাব মনে হলেও আমি বলব নারী হওয়ার কারণে ছোট বেলা থেকে মেয়ে মানুষের এটা করা যাবে না, ওটা করে যাবে না এই বাধ্যবাধকতাই যেন একটা নারীকে মারাত্মক অপরাধী মানুষ হওয়া থেকে বাঁচায়। এটাই একজন নারীকে নিজের অস্বাভাবিক খায়েশের লাগাম টেনে ধরে নিজেকে সুস্থির রাখতে এবং ন্যায় ও অন্যায়ের ভেদাভেদ করতে শেখায়। সমাজের জন্য অনাকাঙ্ক্ষিত আজেবাজে কাজ করা থেকে মেয়েদেরকে বিরত রাখে এই লিঙ্গ বৈষম্যমূলক বাধ্যবাধকতা।
তাই তো গুন্ডা-ছিনতাইকারি, খুনি, নারী সমাজে সেভাবে থাকে না। তাদেরকে ছোট বেলা থেকেই ছোটখাটো ভুল হলেই শেখানো হয় যে, “তোমার এটা করা ঠিক না, ওটা করা ঠিক না।” অন্যায় করার পরও বলা হয় না “মেয়েরা একটু এমনই হয়।” এছাড়া স্বভাবগতভাবেও নারীরা একটু নমনীয় হয়ে থাকে। তাই বাঙ্গালি সমাজে প্রেম বা পরকীয়াঘটিত অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার মতো অন্যায় কাজ ছাড়া বড় ধরণের তেমন কোনও অপরাধমূলক কাজে মেয়েদের খুব একটা জড়িয়ে পড়তে দেখা যায় না।বাঙ্গালি গ্রামীণ সমাজে এমন ঘটনা অহরহ দেখা যায়, একটা সম্ভ্রান্ত বংশের ছেলে যাকে সবাই ভাল বলেই জানে সেও বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে কারও গাছের আম, কারও গাছের ডাব বা লিচু চুরি করে খায়। কেউবা প্রতিবেশির মুরগি ধরে জবাই করে বন্ধুদের সাথে জমসে পিকনিকের আয়োজন করে।
এমন ঘটনা বাবা-মা বা মুরুব্বিরা জানলে তেমন প্রতিক্রিয়া দেখায় বলে আমার মনে হয় না। এটা যে এক ধরনের বড় অন্যায় কাজ কেউ তাদের বলে না। কোনও কোনও অবিভাবক দুইএকটা ধমক দিয়ে সন্তানকে সুপথে আনার চেষ্টা করলে অধিকাংশ অবিভাবক এমন ছোটখাটো অন্যায়কে পাত্তা দেন না। অনেক মুরব্বিতো আবার মন্তব্য করেই বসেন, “এই বয়সে আমরাও কতো চুরি করছি আম-জাম। এই বয়সে ছেলেরা একটু এমনই হয়।”একটা গরীব চোরকে মানুষের বাসায় চুরি করার দায়ে যে রকমের শাস্তি দেয়া হয়, তেমন কোনও শাস্তি কিন্তু দেয়া হয় না বিনোদনের উদ্দেশ্যে চুরি করা অল্প বয়সী ছেলেদের। বরং ‘এই বয়সে ছেলেরা একটু এমনই হয়’ এই কথার ছলে তাদের উঠতি বয়সের উন্মাদনায় আরও ঘি ঢালা হয়। তাদের ছোট ছোট খারাপ কাজের মৌখিক অনুমোদন দিতে দিতে আমরা তাদেরকে আরও মারাত্মক খারাপ কাজ করতে প্রতিনিয়ত উদ্বুদ্ধ করে থাকি। অনেক সময় উঠতি বয়সী ছেলেদের মামাতো বা চাচাতো বোনের সাথে চুটিয়ে প্রেম করা, বন্ধুর ছোট বোনের সাথে প্রেম প্রেম খেলা, এমনকি অনৈতিক সম্পর্কের কাহিনীকেও ‘বয়সের দোষ’ বলে তাদের জন্য সহীহ করে দেই!অনেক সময় দেখা যায় যে, রাস্তায় উদ্ভ্রান্ত কোনও ছেলে যখন কোনো মেয়েকে ইভটিজিং করে বা কোন মেয়ের গায়ে হাত দেয়, তখনও অবিভাবক তাদের ছেলের বিরুদ্ধে তেমন কোনও পদক্ষেপ নেয় না।
বরং সন্তানের কুকর্ম ধামা চাপা দেয় বেশ কৌশলে। কেউ কেউ আবার নিজের ছেলেকে নিস্পাপ ঘোষণা দিয়ে ইভটিজিং এর শিকার মেয়েটার উপরই নিজের ছেলের কুকর্মের দ্বায় চাপিয়ে দেয় নির্দ্বিধায়! তাদের ভাষ্য মতে নিশ্চয় মেয়েটার পোশাক খারাপ ছিল! সে নিজেই ছেলেটাকে সিডিউস করেছে! উদোর পিণ্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপিয়ে আবার ছেলে মানুষকে ছেলে হওয়ার সুবাদে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাড় না করিয়ে সানন্দে ছাড় দেয়া হয়। অবশ্য এটা ঠিক যে ইদানিং মেয়েদের উগ্র চলাফেরা ছেলেদেরকে অনেকটা উদ্বুদ্ধ করে মেয়েদের প্রতি বাজেভাবে আকৃষ্ট হতে। কিন্তু তাই বলে কি এই অসামাজিক কাজের জন্য ছেলেটার কোনও দ্বায় নেই? আমাদের সমাজে প্রতিটি পরিবারে এমন নৈতিক শিক্ষাভিত্তিক মূল্যবোধ গড়ে উঠা উচিৎ যেখানে ন্যায়-অন্যায়ের সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে ছেলে বা মেয়ে বলে কোনও বিভেদ থাকবে না।
যেটা অন্যায় বা অপরাধ সেটা ছেলে হোক আর মেয়ে হোক সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে অন্যায় বা অপরাধ। কোনও ধরনের খারাপ কাজে নিজেকে জড়িত না রাখার সুষ্ঠু শিক্ষা ছেলে-মেয়ে উভয়কেই পরিবার থেকেই দিতে হবে।একবার এক পহেলা বৈশাখে হাজার লোকের মাঝে কিছু বখাটে ছেলে কর্তৃক দুই-একজন নারীর শ্লীলতাহানীর চেষ্টা চলেছিল। ঐ সময় শ্লীলতাহানীর বিষয় নিয়ে সাধারণ জনমতের ভিত্তিতে দুই ধরনের প্রান্তিক অবস্থান তৈরি হয়েছিল। এক পক্ষ বলছিল, ‘যে মেয়েদের শ্লীলতাহানী হয়েছে তারা খারাপ মেয়ে, তাই তাদের এই দশা হয়েছে। ভদ্র মেয়ে হলে এমনটা হতো না। তারা এমন অনুষ্ঠানে কেন যাবে যেখানে সাংস্কৃতিক চর্চার চেয়ে বেলেল্লাপনার চর্চা বেশি চলে?’ অন্য দিকে আর এক পক্ষ এই অঘটনের সমস্ত দায়ভার চাপিয়ে দিচ্ছিল ছেলেদের উপর! ‘নষ্ট ছেলের দল!! তারা কেন এমন করবে? মেয়েরা কেমন পোশাক পরবে সেটা তাদের নিজস্ব চয়েস। এটা তাদের পোশাকের স্বাধীনতা । মেয়ে পেলেই তার উপর জানোয়ারের মতো হামলা করতে হবে? এটা কোন ধরনের অসভ্যতা?
এদের বিচার চাই, এদের বিচার করতে হবে।’এমন অন্যায়ের আসলেই বিচার হওয়া উচিৎ। তবে তার আগে আমাদের প্রান্তিক চিন্তাধারায় একটু লাগাম টানতে হবে। আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে দোষটা আসলে কার? আমি উভয় পক্ষের উদ্দেশ্যে বলতে চাই ছেলে বা মেয়ে কাউকে এককভাবে দোষ দেয়ার আগে আমাদের পরিবার ও সমাজ ব্যবস্থার দিকে একবার চোখ বুলাতে হবে। যেখানে একটা ছেলে ছাড় পেয়েই বড় হয় যে “ছেলেরা একটু এমনই হয়”সে সমাজে বেড়ে উঠা উঠতি বয়সী ছেলের থেকে আমরা এর চেয়ে আর ভাল কি আশা করতে পারি? যে সমাজে মেয়েদের স্বাধীনতা দেয়ার নামে বেলাল্লাপনার ট্রেনিং দেয়া হয়; সেখানে আমরা মেয়েদেরকে নিরাপদ রাখবো কিসের ভিত্তিতে?নারীরা লিঙ্গ বৈষম্যের শিকার হয়ে পশ্চাৎপদ হলেও দেখবেন একটা পরিবার মেয়েকে বই-কলম হাতে দিতে নারাজ থাকলেও তার হাতে লিপস্টিক, প্রসাধনীর সরঞ্জাম কিনে দিতে একটুও কার্পণ্য করে না ।
মেয়েদেরকে যেন একজন দেহসর্বস্ব মানুষ হিসাবে গড়ে তোলা হয়! নিজেকে কতো আকর্ষণীয় করে তোলা যায় সেটার জন্য ক্রমাগত অনুপ্রেরণা ও দিক নির্দেশনা পেয়ে আসে পরিবারের বড়দের কাছ থেকে। শাড়ির ভাঁজ কীভাবে ফেললে নিজেকে বেশি নিটোল ললনা লাগবে? কোন রংয়ের ড্রেসের সাথে কোন কালারের লিপস্টিক বা মেকআপ মানানসই হবে সেটার প্রশিক্ষণ দেয়া হয় অনেক পরিবারে। বাইরের পুরুষের সামনে নিজেকে আধা উদোম ও আকর্ষণীয় করে উপস্থাপন করলে আসলে যে নারীর নিজের সমস্যা হতে পারে, এটা অধিকাংশ পরিবারে মেয়েদেরকে শিক্ষা দেয়া তো দূরের কথা, এর ভয়াবহতাটুকুওপর্যন্ত জানানো হয় না!যে সমাজ ব্যবস্থায় ছেলে মানুষেরা “ছেলেরা একটু এমনই হয়” এই বক্তব্যের সুবাদে ছাড় পেয়ে পেয়ে নিজের কোন কাজটা করা উচিৎ কোন কাজটা করা উচিৎ না ভুলে গেছে; সেই সমাজে একটা মেয়ে নিজেকে কিছুটা খোলামেলা ও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করলে ছেলেদের কুদৃষ্টি, কু-মন্তব্যের এমনকি ধর্ষণের শিকার হবে না এমন প্রত্যাশা করা আকাশ কুসুম কল্পনা ছাড়া আর কিছু না। পরিশেষে বলতে চাই পরিবার ও সমাজে এমন সুনিয়ন্ত্রিত রীতিনীতি এবং প্র্যাকটিস চালু হওয়া উচিৎ, যেখানে ছেলে হোক আর মেয়ে হোক কারও জন্য অন্যায় বা অপরাধ করার কোন অনুমোদন থাকবে না। প্রতিটি পরিবার ছেলে-মেয়ে উভয়কে নৈতিক মূল্যবোধে শিক্ষাদানে অংশগ্রহণ করবে ।
ছেলেদেরকে শিক্ষা দিতে হবে মেয়েদের গায়ে হাত দেয়া বা তাদের দিকে বাজে দৃষ্টিতে তাকানো যাবে না। অন্যদিকে মেয়েদেরকেও শিক্ষা দিতে হবে ছেলেদের সামনে খোলামেলা ভাবে ঘোরা-ফেরা যাবে না। উভয় পক্ষকে কোনো ধরনের নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষা না দিয়ে তাদের উপর শুধু দোষ চাপিয়ে কোন লাভ হবে না। ছেলে-মেয়ে উভয়কে নৈতিক, মানবিক এবং পারিবারিক সুষ্ঠু শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে এ সমাজ, এ পৃথিবীকে নিরাপদ ও শঙ্কাহীন আবাসভূমিতে পরিণত করতে হবে । তাদেরক জানাতে হবে নৈতিকতা সম্পন্ন ব্যক্তিকে রাসুল (সাঃ) সর্বোত্তম লোক বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে ওই ব্যক্তিই উত্তম, যার চরিত্র উত্তম।’ (বোখারি ও মুসলিম) । আর আমাদের Duke of Wellington এর এই উক্তিটিও ভুলে গেলে চলবে না “If you teach your children the three R’s (Reading, Writing, Arithmetic) and leave the fourth ‘R’ (Religion), you will produce a fifth ‘R’ (Rascaldom) & get a nation of cunning devils”. অর্থাৎ “আপনি যদি আপনার সন্তানকে তিনটা R তথা পড়া, লেখা এবং গণিত শেখান কিন্তু চতুর্থ-R ধর্মটা বাদ দেন তাহলে একটা ৫ম R মানে একটা Rascal বা বদমাশ পাবেন এবং ধূর্ত শয়তান একটি জাতি পাবেন।”